ভোট গণনার মধ্যেই ইসরায়েলে ডানপন্থীদের বিতর্কিত মন্তব্য

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
শেয়ার করুন:

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনার মধ্যেই আরব ভোটার, বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এবং গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে ডানপন্থী নেতাদের একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর ডানপন্থী মিত্রদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং আরব ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন আরব রাজনৈতিক নেতারা। অন্যদিকে ডানপন্থী নেতারা বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য বিজয় ও ভবিষ্যৎ সরকার গঠন নিয়ে নিজেদের অবস্থান জোরালো করেছেন।
‎
‎বুধবার, ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় এবং ভোট গণনার প্রাথমিক পর্যায়ে এসব মন্তব্য সামনে আসে। নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের প্রত্যাশিত ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার পর রাজনৈতিক বক্তব্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
‎
‎আরব ভোটারদের নিয়ে নেতানিয়াহুর মন্তব্য
‎
‎নির্বাচনের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, আরব ভোটাররা বিপুলসংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন এবং নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। তিনি আরব ভোটারদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ডানপন্থী সমর্থকদের লিকুদ পার্টির পক্ষে ভোট দিতে উৎসাহিত করেন।
‎
‎এক পর্যায়ে তিনি আরব-অধ্যুষিত দল রা’আমের তিনজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচন চুরির চেষ্টার অভিযোগও তোলেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা থেকে বলা যায় যে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা নির্বাচনে কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
‎
‎ইসরায়েলি পুলিশ ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা রা’আম দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
‎
‎নেতানিয়াহুর এসব বক্তব্যের পর আরব রাজনৈতিক নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, আরব ভোটারদের অংশগ্রহণকে সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করে ডানপন্থী ভোটারদের সংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
‎
‎গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের ঘোষণা স্মোটরিচের
‎
‎ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থী নেতা বেজালেল স্মোটরিচও নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন। বুধবার ভোরে জেরুজালেমে তাঁর ধর্মীয় জায়নবাদী দলের নির্বাচনী কার্যালয়ে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, বিরোধীরা ক্ষমতায় এলেও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের নীতি উল্টে দিতে পারবে না।
‎
‎তিনি আরও ঘোষণা করেন, গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপন করা হবে।
‎
‎স্মোটরিচের এই বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে তাদের বসতি ও স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করেছিল। সেখানে পুনরায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রচেষ্টার ওপর নতুন করে প্রভাব ফেলতে পারে।
‎
‎আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে অবৈধ বলে বিবেচনা করে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ। ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অন্যতম বিতর্কিত বিষয়।
‎
‎স্মোটরিচ নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও দাবি করেছিলেন, আরব অধ্যুষিত এলাকা এবং বামপন্থী সমর্থকদের মধ্যে ভোটদানের হার বেশি হলে ডানপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তবে তিনি এ দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেননি।
‎
‎‘নির্বাচন চুরির চেষ্টা’—মিরি রেগেভের অভিযোগ
‎
‎নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেত্রী ও পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, বিরোধীরা নির্বাচন এবং দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
‎
‎তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ‘ডানপন্থা অথবা ফিলিস্তিন’—এমন দ্বিমুখী অবস্থানের মধ্যেও তুলে ধরেন। এ ধরনের বক্তব্য ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে।
‎
‎তবে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং ভোটারদের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার দাবি প্রমাণসাপেক্ষ। কোনো রাজনৈতিক নেতার অভিযোগকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তবেই এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
‎
‎আরব রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া
‎
‎নেতানিয়াহুর নির্বাচনী দিনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন আরব রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের মতে, আরব নাগরিকদের ভোটদানের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন বক্তব্য বর্ণবাদী মনোভাব ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাড়াতে পারে।
‎
‎রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ডানপন্থী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে ভয় সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিনও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের অবসানের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
‎
‎ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন। ফলে তাঁদের ভোটের উপস্থিতি বা রাজনৈতিক পছন্দকে কেন্দ্র করে বিতর্ক নির্বাচনী প্রচারের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
‎
‎নির্বাচনের ফল নিয়ে কেন এত উত্তেজনা?
‎
‎ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠন করতে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবং বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবিরের মধ্যে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
‎
‎রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের প্রাথমিক পূর্বাভাসে দুই শিবিরের আসনসংখ্যা প্রায় সমান ছিল। ফলে সরকার গঠনের জন্য ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‎
‎এই পরিস্থিতিতে আরব-অধ্যুষিত দলগুলোর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের সমর্থন কোনো পক্ষের সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে। আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনার বিরোধিতা করে নেতানিয়াহু ও তাঁর ডানপন্থী মিত্ররা যে অবস্থান নিয়েছেন, তা সরকার গঠনের আলোচনা আরও জটিল করতে পারে।
‎
‎তবে বুথফেরত জরিপ চূড়ান্ত ফলাফল নয়। ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা শেষ হওয়ার আগে কোন পক্ষ সরকার গঠন করবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
‎
‎সামনে কী হতে পারে?
‎
‎নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে ডানপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে দর-কষাকষি আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজায় ভবিষ্যৎ ইসরায়েলি নীতি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকতে পারে।
‎
‎নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্রদের বক্তব্য নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শুধু সরকার গঠনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং ইসরায়েলের জাতীয় পরিচয়, আরব নাগরিকদের অধিকার এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ককে সামনে এনেছে।
‎
‎সব মিলিয়ে, ভোট গণনার সময় ইসরায়েলি ডানপন্থী নেতাদের বিতর্কিত বক্তব্য দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে নির্বাচনে কারচুপি বা অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা, ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সমীকরণ এবং গাজায় বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও তথ্য ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
‎
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, ২৮ অক্টোবর ২০২৬; রয়টার্সের ইসরায়েল নির্বাচনসংক্রান্ত প্রতিবেদন।