ইসরায়েলের নির্বাচনে কোন দল, কোন নেতা?

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
শেয়ার করুন:

‎ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে প্রাথমিক ভোটের হিসাবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসার আভাস পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতিতে নিজের সরকারের সামরিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক অর্জন তুলে ধরেছেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে ইরানের হুমকি মোকাবিলা এবং ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তবে প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে থাকলেও তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
‎
‎নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাবে এগিয়ে লিকুদ
‎
‎মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রাথমিক হিসাব ও পূর্বাভাসে লিকুদ পার্টিকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়। বুধবার, ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট গণনার সময় নেতানিয়াহুর জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫৫ এবং বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫০ বলে অনুমান করা হচ্ছিল। বাকি আসনগুলোর হিসাব ও চূড়ান্ত ফল তখনও নির্ধারিত হয়নি।
‎
‎অন্যদিকে, ইসরায়েলি গণমাধ্যমের বিভিন্ন পূর্বাভাসে লিকুদ পার্টিকে এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনা দেখানো হয়। তবে দল হিসেবে এগিয়ে থাকা আর সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা এক বিষয় নয়। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন।
‎
‎ফলে লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হলেও নেতানিয়াহুর জোটকে সরকার গঠনের জন্য ছোট দলগুলোর সমর্থন আদায় করতে হতে পারে। প্রাথমিক হিসাবের পরিবর্তন এবং জোট গঠনের আলোচনা—দুটিই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‎
‎নিজের সরকারের অর্জন তুলে ধরলেন নেতানিয়াহু
‎
‎ভোটের প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির নির্বাচনী কার্যালয়ে সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি নিজের সরকারের সামরিক অভিযান, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থানকে প্রধান অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন।
‎
‎নেতানিয়াহুর দাবি, গত কয়েক বছরে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বলয় প্রতিষ্ঠা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
‎
‎তিনি আরও দাবি করেন, হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েল তার প্রতিপক্ষের সক্ষমতা দুর্বল করেছে। তাঁর বক্তব্যে মোহাম্মদ দেইফ, ইসমাইল হানিয়া, ইয়াহিয়া সিনওয়ার, হাসান নাসরাল্লাহ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির নামও উঠে আসে।
‎
‎তবে এসব বক্তব্য নেতানিয়াহুর নিজের সরকারের অর্জন সম্পর্কে দেওয়া মূল্যায়ন। সামরিক সাফল্যের দাবি এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। এসব অভিযানের মানবিক মূল্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ওপর প্রভাব নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে।
‎
‎ইরানকে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
‎
‎বক্তব্যে ইরানকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেন নেতানিয়াহু। তাঁর দাবি, ইরানের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে এবং ইসরায়েল এখন তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
‎
‎যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের কাছ থেকে ইসরায়েলের জন্য বিদ্যমান অস্তিত্বগত হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‎
‎তবে ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কী ধরনের নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে পূর্ণাঙ্গ নতুন কর্মপরিকল্পনা প্রকাশিত হয়নি। বরং ইরানকে মোকাবিলা, সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোই তাঁর বক্তব্যে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
‎
‎এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, নেতানিয়াহু সরকার গঠন করতে পারলে ইরানকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে অবস্থান ধরে রাখতে পারেন। তবে সম্ভাব্য পদক্ষেপের প্রকৃতি ও পরিধি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বিস্তারিত তথ্য এখনো সীমিত।
‎
‎আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট নয়, ডানপন্থী সরকার চান নেতানিয়াহু
‎
‎নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে একটি শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন একটি সরকার প্রয়োজন, যা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেবে।
‎
‎তিনি আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল জোট সরকার গঠনের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলের অস্তিত্বের বিরোধিতা করে—এমন আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠন না করার কথা উঠে আসে। এই অবস্থান সরকার গঠনের আলোচনায় রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
‎
‎কারণ, কোনো দল বা জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নেতানিয়াহু যদি আরব দলগুলোর সমর্থন প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে তাঁকে ডানপন্থী ও অন্যান্য গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমর্থন খুঁজতে হবে।
‎
‎অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের নেতা ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকট নির্বাচনের ফলকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে জনমতের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে নতুন নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক পথের প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে।
‎
‎এতে স্পষ্ট, নির্বাচনের প্রতিযোগিতা শুধু কোন দল বেশি আসন পাবে, সেই হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব অব্যাহত থাকবে কি না এবং ভবিষ্যৎ সরকার কোন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‎
‎নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান বিবেচনায় নিরাপত্তা ও নেতৃত্ব
‎
‎২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটি ছিল ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ফলে নির্বাচনটি নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর সরকারের ভূমিকা এবং পরবর্তী যুদ্ধগুলোর প্রভাব নিয়ে জনমত যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
‎
‎নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী বক্তব্যে বড় জায়গা পেয়েছে। তিনি নিজের সরকারের সামরিক অভিযানকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে ভবিষ্যতেও কঠোর নিরাপত্তানীতি অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
‎
‎অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের বক্তব্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং নতুন রাজনৈতিক পথের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ভোটারদের সামনে একদিকে বর্তমান সরকারের নিরাপত্তানীতির ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা—এই দুই অবস্থানের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে।
‎
‎নির্বাচনের ফলাফলকে তাই কেবল দলীয় আসনসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুদ্ধের প্রভাব, সরকারের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুই এই নির্বাচনের তাৎপর্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।
‎
‎সরকার গঠনে এখনো অনিশ্চয়তা
‎
‎ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তাঁরা পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচনের জন্য দলকে ভোট দেন। এরপর পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করে সরকার গঠন করতে হয়।
‎
‎চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থীকে দায়িত্ব দেবেন। মনোনীত প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় দেওয়া হতে পারে।
‎
‎যদি কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে বিকল্প প্রার্থীর জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোনো সরকার গঠন সম্ভব না হলে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে বিদায়ী সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
‎
‎নেতানিয়াহু নিজেও ভোটের প্রাথমিক হিসাবকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রকৃত ফলাফল জানতে আরও এক বা দুই দিন অপেক্ষা করতে হবে।
‎
‎সামনে কী হতে পারে?
‎
‎প্রাথমিক ফলাফলে লিকুদ পার্টির এগিয়ে থাকার আভাস নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকার গঠনের পথ এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁকে একদিকে নিজের রাজনৈতিক মিত্রদের সমর্থন ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য জোটের সমীকরণ মেলাতে হবে।
‎
‎সরকার গঠন করতে পারলে ইরানকে মোকাবিলা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তানীতির ধারাবাহিকতা এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মসূচি তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারে থাকতে পারে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ নির্ভর করবে নতুন সরকারের গঠন, জোটের শর্ত এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর।
‎
‎অন্যদিকে, বিরোধী শিবির যদি প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারে, তাহলে ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
‎
‎সব মিলিয়ে, লিকুদ পার্টির প্রাথমিক অগ্রগতি নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও এটিকে চূড়ান্ত বিজয় বলা যাচ্ছে না। ভোট গণনার চূড়ান্ত ফল এবং সরকার গঠনের আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে।
‎
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং টাইমস অব ইসরায়েল। প্রতিবেদন তৈরির সময় ২৮ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।