নেতানিয়াহুকে বিদায়ের বার্তা আইজেনকটের

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
শেয়ার করুন:

ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবসান ঘটানোর দাবি জানিয়েছেন বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দুই শিবিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়ার পর তিনি নেতানিয়াহুকে জনগণের রায় মেনে নিয়ে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নতুন সরকার গঠনে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

‎

‎তবে নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনা তৈরি করলেও কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

‎

‎নেতানিয়াহুকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান

‎

‎মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোল প্রকাশিত হয়। এসব জরিপে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবিরের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যায় খুব সামান্য ব্যবধান দেখা যায়। কোনো কোনো জরিপে দুই পক্ষকে প্রায় সমানে সমান অবস্থানে দেখানো হয়।

‎

‎এই পরিস্থিতিতে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট বলেন, ইসরায়েলের জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন।

‎

‎তিনি নেতানিয়াহুকে জনগণের অনাস্থার বার্তা গ্রহণ করে রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। আইজেনকটের বক্তব্যের মূল কথা ছিল, নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে নেতানিয়াহুর উচিত ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা বন্ধ করা।

‎

‎তবে আইজেনকটের এই বক্তব্য বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

‎

‎নতুন সরকার গঠনের উদ্যোগ বিরোধীদের

‎

‎আইজেনকট জানিয়েছেন, তিনি এমন একটি সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন, যা ইসরায়েলের নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে।

‎

‎তাঁর প্রস্তাবিত রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা, সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠা এবং হামাসের সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলার মতো বিষয়। একই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনার কথাও বলেছেন তিনি।

‎

‎তবে বিরোধী শিবিরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন একত্র করা। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরোধিতা নিয়ে ঐকমত্য থাকলেও সব নীতিগত বিষয়ে তাদের অবস্থান এক নয়।

‎

‎বিশেষ করে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধী শিবিরের ভেতরে রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য তাদের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু কিছু দল এ ধরনের জোটে অংশ নেওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

‎

‎নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে কী দেখা যাচ্ছে?

‎

‎ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

‎

‎রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের পর প্রকাশিত বিভিন্ন এক্সিট পোলে নেতানিয়াহুর শিবির ও তাঁর বিরোধী শিবিরের মধ্যে ব্যবধান খুব কম ছিল। কান ১১ ও চ্যানেল ১৩-এর প্রাথমিক পূর্বাভাসে দুই শিবিরকে ৫১টি করে আসনের কাছাকাছি অবস্থানে দেখা যায়। অন্যদিকে, চ্যানেল ১২-এর পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবির সামান্য এগিয়ে ছিল।

‎

‎এদিকে লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করলেও সেটি সরকার গঠনের নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ, ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে সরকার পরিচালনার জন্য অন্যান্য দলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হয়।

‎

‎বুথফেরত জরিপের সঙ্গে প্রকৃত ফলাফলের পার্থক্যও হতে পারে। তাই চূড়ান্ত ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষকে নিশ্চিত বিজয়ী বলা ঠিক হবে না।

‎

‎নেতানিয়াহুও সরকার গঠনের দাবি ছাড়ছেন না

‎

‎বিরোধী শিবিরের বক্তব্যের বিপরীতে নেতানিয়াহু তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠন করা প্রয়োজন।

‎

‎তিনি নিজের সরকারের সামরিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ইরানের হুমকি মোকাবিলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান জোরদার করার বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।

‎

‎নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠনেরও বিরোধিতা করেছেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবিরের জন্য সরকার গঠনের আলোচনায় রাজনৈতিক মিত্রদের সমর্থন ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‎

‎এ অবস্থায় নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—দুই পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে সরকার গঠনের সম্ভাবনা ধরে রাখতে চাইছেন। কিন্তু চূড়ান্ত আসনসংখ্যা এবং সম্ভাব্য জোটের সমীকরণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন।

‎

‎রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

‎

‎ইসরায়েলের এই নির্বাচনকে শুধু দুটি রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে আসন ভাগাভাগির প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর সরকারের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

‎

‎২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সরকারের জবাবদিহি এবং পরবর্তী যুদ্ধগুলোর প্রভাব দেশটির রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে রয়েছে। নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁর নিরাপত্তানীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধীরা নেতৃত্বের পরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

‎

‎এখন নজর থাকবে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফল, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আলোচনা এবং সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন কে নিশ্চিত করতে পারেন, সেদিকে।

‎

‎সব মিলিয়ে, বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের ‘নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ’—এমন বক্তব্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। কিন্তু নেতানিয়াহু সত্যিই ক্ষমতা হারাচ্ছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চূড়ান্ত ফলাফল ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে।

‎

‎তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের নির্বাচনী প্রতিবেদন।

‎