ইরানের হামলার আশঙ্কায় সতর্ক যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীসংখ্যা কমানো হয়েছে। তবে ইরান ঠিক কখন, কোথায় বা কীভাবে হামলা চালাতে পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
আল জাজিরার ২৪ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন ২৩ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে পাঠানো একটি স্মারকে ইরানের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে উদ্বেগ তুলে ধরেন। অ্যাক্সিওস প্রথম স্মারকটির তথ্য প্রকাশ করে। পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও এবিসি নিউজও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
স্মারকে বলা হয়েছে, বিদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি অঞ্চলে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। তবে স্মারকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, সম্ভাব্য হামলার সময় কিংবা পরিকল্পনার পূর্ণ বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি।
কেন সতর্ক অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র?
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও আলোচনা অচলাবস্থায় রয়েছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তৃতীয়ত, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সংঘাত আরও বাড়লে বিদেশে অবস্থানরত কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং অন্যান্য মার্কিন নাগরিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
তবে গোয়েন্দা সতর্কতা মানেই হামলা অবশ্যম্ভাবী—এমন নয়। এটি সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের অংশ।
কোন কোন দেশে কমানো হয়েছে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীসংখ্যা?
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাস এবং জেদ্দা ও ধাহরানের কনস্যুলেট থেকে অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, কাতার ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলোতেও কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব দূতাবাস সীমিত কার্যক্রমের আওতায় খোলা রয়েছে। তবে সৌদি আরবের মতো অন্য চারটি দেশে সব কর্মীকে বাধ্যতামূলকভাবে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের সম্ভাব্য তৎপরতার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলার আশঙ্কাও কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও হামলা চালাতে পারে?
আল জাজিরার প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইউরোপের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিছু গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইরানি অপারেটিভদের তৎপরতা সম্পর্কেও আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
তবে এসব তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। একই প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তার মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়, ইরানের সব ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। ফলে সম্ভাব্য হামলার হুমকি এবং বাস্তবে তা পরিচালনা করার সক্ষমতাকে আলাদা করে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, যা দিয়ে সম্ভাব্য সব হামলার পরিকল্পনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব।
অতীতেও মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ উঠেছে
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে আসছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চে একজন পাকিস্তানি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যার ষড়যন্ত্রের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন। মার্কিন কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নির্দেশের অভিযোগ তুলেছিল।
এ ছাড়া ২০২২ সালে সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এক সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে অতীতের এসব অভিযোগ বর্তমান গোয়েন্দা সতর্কতার প্রতিটি বিষয়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ করে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনাও বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনী। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালি বা অন্য কোথাও সংঘাত বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবন, আঞ্চলিক দেশগুলোর স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের বাজার এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও নতুন সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি না হলে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা দূতাবাসে কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রস্তুতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার দাবি নাকচ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আঞ্চলিক হুমকিই কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
অর্থাৎ, নতুন সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা থাকলেও দূতাবাসের কর্মী প্রত্যাহারকে এককভাবে আসন্ন হামলার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছে এবং ওয়াশিংটন বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে। অন্যদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে।
তবে ইরান নতুন করে মার্কিন নাগরিকদের ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন সামরিক অভিযান শুরু করবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
বিশ্লেষণ ধর্মীভাবে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে গোয়েন্দা সতর্কতা, সামরিক হুমকি এবং কূটনৈতিক আলোচনা—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং আলোচনার অগ্রগতির ওপর।
সূত্র: আল জাজিরা, অ্যাক্সিওস, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও এবিসি নিউজ; ২৩–২৪ অক্টোবর ২০২৬








