ইরান ইস্যুতে ইস্তাম্বুলে বিশ্বনেতাদের বৈঠক
ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তুরস্ক। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে কূটনীতি ও সংলাপের পথ বেছে নেওয়া জরুরি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তুরস্কের ইস্তাম্বুলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন হাকান ফিদান। বৈঠকে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ, সৌদি আরবে হামলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে তুরস্ক, মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইতালির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলোর এই সম্মিলিত আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানকে ঘিরে সংঘাতের আরও বিস্তার ঠেকানো এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা।
সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদান বলেন, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা হলে এই যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামরিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই সংকটের কার্যকর সমাধান নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সংঘাত বন্ধ করতে হলে উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ
তুরস্কের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে আগের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে নতুন হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত নয়। ফলে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বাস্তবে হামলা চালানোর সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘাতের অবসান নিয়ে যোগাযোগের কথাও সামনে এসেছে। কিন্তু কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা অগ্রসর হয়েছে এবং তা যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
এই পরিস্থিতিতে তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ মনে করছে, নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রই নয়, আশপাশের দেশগুলোও নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
ফ্রান্সের সতর্কবার্তা: বাড়তে পারে জ্বালানির দাম
বৈঠকের পর ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারোও নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হলে কোনো পক্ষই প্রকৃত অর্থে লাভবান হবে না। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলসহ জ্বালানি পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি এই নৌপথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি
ইস্তাম্বুলের বৈঠকে সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর হামলার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ইয়েমেনের সংঘাত এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো নিরাপদ রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত হলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলোর বক্তব্যে সামরিক উত্তেজনা কমানো, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংযম দেখানো এবং আলোচনার সুযোগ ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সংঘাত কত দ্রুত কমবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো অগ্রগতি ঘোষণা করা হয়নি।
কূটনৈতিক সমাধানের পথ কতটা কার্যকর হবে?
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংকটের সমাধানে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর জোর দিয়ে আসছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংঘাত বন্ধের প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের সমাধান খুঁজতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সৌদি আরবের সুরক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা এবং বাস্তবসম্মত সমঝোতা জরুরি। নতুন করে হামলা শুরু হলে আলোচনার পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, উত্তেজনা কমানো সম্ভব হলে যুদ্ধ বন্ধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা না চালানো এবং সংঘাতকে আরও বিস্তৃত হতে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অগ্রগতির দিকে।
সূত্র: রয়টার্স।








