সৌদির ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা সম্প্রসারণ, বাড়তে পারে শক্তি
সৌদি আরবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানার সম্প্রসারণের ফলে আরও বড়, অধিক পাল্লার এবং বেশি ওজনের সরঞ্জাম বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই গবেষকের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আল-দাওয়াদিমি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কমপ্লেক্সে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তোলা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এই মূল্যায়ন করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক স্যাম লেয়ার ও মাইকেল ডুইটসম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন ভবনটির ভেতরে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের মোটর তৈরিতে ব্যবহৃত ঢালাই গর্ত থাকতে পারে। ভবনটির আকার বিদ্যমান একই ধরনের স্থাপনার তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া কাছাকাছি আরেকটি নতুন ভবন তৈরি করা হয়েছে, যা জ্বালানির উপাদান অথবা প্রস্তুত ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
গবেষকদের মতে, নতুন স্থাপনাটি চালু হলে সৌদি আরবের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায় এবং তরল জ্বালানিচালিত ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণের উপযোগী করা সম্ভব। ফলে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
প্রতিবেদনে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীনা প্রযুক্তির সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, দেশটি চীনা নকশার ডিএফ-১৫ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। সম্প্রসারিত স্থাপনাটি আরও দীর্ঘপাল্লার ডিএফ-২১ অথবা একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের উপযোগী হতে পারে বলেও তাঁরা ধারণা দিয়েছেন। তবে কারখানাটিতে ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হবে, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থাপনাটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে। গবেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সেখানে উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য সময়সীমা, নিশ্চিত উৎপাদন শুরুর ঘোষণা নয়।
সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক সাশা ব্রুখম্যানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, অধিক পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধবিমান ব্যবহার না করেও দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার বিকল্প দিতে পারে।
একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকিও সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে দেশটি অস্ত্রের সরবরাহ ধরে রাখা এবং সামরিক নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে এই সম্প্রসারণ আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অগ্রগতি প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। চুক্তির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ এবং পারমাণবিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইনপ্রণেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা সম্প্রসারণের তথ্য দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার প্রমাণ নয়। সৌদি আরবও এমন পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেনি।
রয়টার্স জানিয়েছে, এ বিষয়ে সৌদি দূতাবাস ও তথ্য মন্ত্রণালয় এবং চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্থাপনার সম্প্রসারণ দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে উৎপাদন শুরুর সময়, ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত ধরন এবং এর পূর্ণ সক্ষমতা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ভারসাম্য ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।
সূত্র: রয়টার্স








