যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ: ফেব্রুয়ারি থেকে বদলে গেছে পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ প্রায় আট মাসে নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে। সামরিক হামলা, পাল্টা আক্রমণ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধ এবং ব্যর্থ সমঝোতার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক অবকাঠামো। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলা চালায়। ফলে সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।
যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার উদ্যোগ
এপ্রিলের ৭ তারিখ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পরে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের স্থায়ী অবসানের চেষ্টা চলে। জুনে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। আগস্টে ওই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ফলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার উদ্যোগ সত্ত্বেও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত ছিল। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রশ্নে মতপার্থক্যও দূর হয়নি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
গত ২২ অক্টোবর ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে সাতটি জাহাজ হামলা বা মাইনের ঘটনার শিকার হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চারটি জাহাজে হামলা চালানো হয় এবং আরও তিনটি জাহাজ মাইনে আঘাত পায়। তবে এসব ঘটনার সব বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। রয়টার্সের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে তেলের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার কথা জানানো হয়।
আলোচনার পথ এখনো খোলা
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। আলোচনার অন্যতম বিষয় ইরানের প্রস্তাবিত সাত দিনের যুদ্ধবিরতি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
তবে দুই পক্ষের শর্তের পার্থক্য এখনো বড় বাধা। ইরান নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের অবসান চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের সমাধান না হওয়ায় স্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা অনিশ্চিত রয়েছে।
ফেব্রুয়ারি থেকে এখন: কী বদলেছে?
ফেব্রুয়ারিতে সংঘাতের মূল কেন্দ্র ছিল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা। কিন্তু অক্টোবর নাগাদ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন, তেল সরবরাহ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কি আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ কমাতে পারবে, নাকি নতুন করে সামরিক সংঘাত তীব্র হবে? এর উত্তর নির্ভর করছে দুই পক্ষের শর্ত, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার অগ্রগতির ওপর।
সব মিলিয়ে, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ অক্টোবরেও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়ছে। স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না এলে এই সংকটের প্রভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।








