ইরানে সরকার উৎখাতের অঙ্গীকার নেতানিয়াহুর
ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার অঙ্গীকার করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরে তিনি দেশটির সরকার উৎখাতকে ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, সামরিক হামলা ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে ইসরায়েল কি সত্যিই ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে?
বুধবার, ২১ অক্টোবর ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করতে দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান। তাঁর দাবি, ইরান আবারও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বিবেচনা করা জরুরি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরান ইস্যুতে আলোচনা করেছেন নেতানিয়াহু। তবে ইরানের সরকার উৎখাতে ওয়াশিংটন নতুন করে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে সম্মত হয়েছে—এমন কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সামরিক শক্তি থাকলেই কি সরকার পরিবর্তন সম্ভব?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার সামর্থ্য ইসরায়েলের রয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো আর ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা সম্ভব হলেও তাতে দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন নিশ্চিত হয় না। অনেক সামরিক স্থাপনা সুরক্ষিত বা ভূগর্ভস্থ হওয়ায় সেগুলোর সব সক্ষমতা একযোগে ধ্বংস করাও কঠিন হতে পারে।
সরকার পরিবর্তনের জন্য ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান, জনগণের ভূমিকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্থল অভিযান ছাড়া কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রের সরকার উৎখাত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, স্থল অভিযান চালাতে গেলে ইসরায়েলকে আরও বড় সামরিক ও কৌশলগত ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।
ইরানের পাল্টা জবাবের ঝুঁকি
ইরানকে লক্ষ্য করে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া নতুন সংঘাতের ফলে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দামের ওপর চাপ পড়তে পারে।
তবে এসব সম্ভাব্য পরিস্থিতি নির্ভর করবে সংঘাতের মাত্রা, ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের অবস্থানের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটনের সামরিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সমর্থন ইসরায়েলের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক সংঘাতে জড়াতে কতটা আগ্রহী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেলেও সেই আলোচনা থেকে ইরানের সরকার উৎখাতের জন্য যৌথ সামরিক পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য তথ্য নেই।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে ইরানকে ঘিরে নেতানিয়াহুর কঠোর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তিনি নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও তা থেকে সামরিক পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা ফলাফল নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
সব মিলিয়ে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা—এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইসরায়েল হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের জন্য ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পরিবর্তন, নিরাপত্তা কাঠামোর অবস্থান এবং জনগণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই নেতানিয়াহুর অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং সামরিক চাপের মধ্যেও দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল থাকে—এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে।
সূত্র: আল জাজিরা, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।








