ইউরেনিয়াম প্রশ্নে অনড় ইরান
যুদ্ধের আশঙ্কা ও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকার মধ্যেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রাখার অবস্থানে অনড় রয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ নিরসনে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও মধ্যস্থতার উদ্যোগ চললেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনো মতপার্থক্য কাটেনি। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই তেহরান জানিয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো অংশই ইরানের বাইরে নেওয়া হবে না।
আল জাজিরার ২১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকের পর এই অবস্থানের কথা জানান। তবে ইরানের ভেতরেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি তিনি।
ইউরেনিয়াম প্রশ্নে ইরানের কঠোর অবস্থান
ইরানের কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু জ্বালানি উৎপাদন বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় নয়; দেশটির নেতৃত্ব এটিকে জাতীয় অধিকার ও কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। তেহরানের দাবি, শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে। তাই সামরিক চাপের মুখে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর বা পুরো কর্মসূচি বন্ধ করার দাবি তারা মেনে নিতে চায় না।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি কমাতে ইরানের কর্মসূচির ওপর কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ঘনঘন বৈঠক, তবুও কাটেনি অনিশ্চয়তা
সংঘাতের অবসান ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক ও যোগাযোগ চলছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের তেহরান সফরের পাশাপাশি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তবে এসব তৎপরতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার কোনো নিশ্চিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। ইরান আলোচনার আগে নিজেদের কিছু শর্ত পূরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি চায়। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।
আন্তর্জাতিক নজরদারি নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং মজুতের প্রকৃত অবস্থা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা—আইএইএ—এর পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন সীমিত হয়ে পড়ায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান পরিমাণ, অবস্থা এবং অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৬ সালেও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কতটা অক্ষত রয়েছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা এক বিষয় নয়। তবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।
সমঝোতার পথ কতটা কঠিন?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের অবস্থান হলো, চাপের মুখে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা হবে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পারমাণবিক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতার দাবি রয়েছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক তৎপরতা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি টেকসই সমঝোতার জন্য ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং সামরিক সংঘাত বন্ধের বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যেও ইউরেনিয়াম প্রশ্নে ইরানের কঠোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ঘনঘন বৈঠক ও মধ্যস্থতার উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও শেষ পর্যন্ত কূটনীতি সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স।








