সৌদি যুবরাজের বড় সংকট

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
শেয়ার করুন:

দি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আঞ্চলিক নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নতুন করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতের নতুন করে তীব্রতা বৃদ্ধি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

‎

‎আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে এমন আলোচনা সামনে এসেছে। তবে যুবরাজের শাসনকালের বর্তমান সময়কে সবচেয়ে খারাপ সময় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে—এমন নির্দিষ্ট মূল্যায়নের মূল প্রতিবেদনটি এখানে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

‎

‎ইয়েমেন সংঘাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অবশ্য সৌদি আরবের সামনে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হুথিদের হামলা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও রিয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর ফলে দেশটির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

‎

‎ইয়েমেন যুদ্ধে প্রত্যাশিত ফল নিয়ে প্রশ্ন

‎

‎২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেওয়া এবং হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চললেও হুথিদের পুরোপুরি পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি।

‎

‎বরং হুথিরা ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবের জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেছে।

‎

‎২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগের পর সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালে পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির ৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক পর্যালোচনায়ও ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি এবং হুথি-সৌদি উত্তেজনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

‎

‎সৌদি আরবের নিরাপত্তায় বাড়তি চাপ

‎

‎সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের বিমান চলাচল, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ২১ অক্টোবরের রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিরা সৌদি আরবের মদিনা বা অন্য কোনো স্থানে ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছিল।

‎

‎এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দাবি ও সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সৌদি আরবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—একদিকে নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা।

‎

‎ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনায় কী প্রভাব পড়তে পারে?

‎

‎মোহাম্মদ বিন সালমানের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো ‘ভিশন ২০৩০’। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, শিল্প ও অন্যান্য খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েছে সৌদি আরব।

‎

‎কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, পর্যটন খাত, পরিবহনব্যবস্থা এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। চ্যাথাম হাউসের ২০২৬ সালের মে মাসের এক বিশ্লেষণেও আঞ্চলিক যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্নকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার জন্য ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎

‎তবে এসব চ্যালেঞ্জের অর্থ এই নয় যে ভিশন ২০৩০ ব্যর্থ হয়ে গেছে। বরং সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সৌদি সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, তার ওপর পরিকল্পনাটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।

‎

‎সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

‎

‎বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। হুথিদের হামলা প্রতিরোধে দেশটি কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে, ইয়েমেনে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেও অর্থনৈতিক সংস্কার অব্যাহত রাখতে পারবে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‎

‎সব মিলিয়ে, ইয়েমেন সংঘাত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কৌশলের একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধান, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সক্ষমতাই আগামী দিনে সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

‎

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ১৪ ও ২১ অক্টোবর ২০২৬; যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি, ৫ অক্টোবর ২০২৬; চ্যাথাম হাউস, মে ২০২৬।

‎