ইরাকে হুথিদের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
শেয়ার করুন:

ইরাকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কার্যক্রম বন্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে দেশটির সরকার। বাগদাদে হুথিদের কার্যালয় বন্ধের বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ইরাকি সরকারের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আল আরাবিয়া ইংলিশ।
‎
‎বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের সংঘাত এবং সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে ইরাকের এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‎
‎হুথিদের কার্যালয় নিয়ে কেন উদ্বেগ?
‎
‎ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন, যারা নিজেদের আনসার আল্লাহ নামে পরিচয় দেয়, দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গোষ্ঠীটির সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতেও তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।
‎
‎২০২৪ সালে বাগদাদের জাদরিয়া এলাকায় হুথিদের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যালয় পরিচালনার খবর প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে ইরাকে তাদের উপস্থিতি, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
‎
‎যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের অন্যতম বিষয় হলো, ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে কোনো হামলা বা সামরিক তৎপরতা পরিচালিত হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। এ কারণে হুথিদের কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়ে বাগদাদের ওপর কূটনৈতিক চাপ রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‎
‎হুথিদের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ
‎
‎২০ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য নিউ আরব জানায়, ইরাকি সরকার বাগদাদে হুথি প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম-সংক্রান্ত কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের সভা, সংবাদ সম্মেলন ও সেমিনার আয়োজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের চলাচল ও বসবাসের ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
‎
‎প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকি কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো—দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে সৌদি আরব বা অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না।
‎
‎তবে হুথিদের কার্যালয় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ এবং কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া এক বিষয় নয়। তাই এ দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
‎
‎সৌদি আরবের নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
‎
‎সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলার খবর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
‎
‎১৪ অক্টোবর ২০২৬ সৌদি আরব সফরের সময় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইরাকি সংবাদ সংস্থার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আল-জাইদি আশ্বাস দিয়েছেন, ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সৌদি আরব কিংবা অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে দেওয়া হবে না।
‎
‎দুই দেশের আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সহযোগিতা জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা এবং ইরাককে আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরে রাখার বিষয়ে বাগদাদ গুরুত্ব দিচ্ছে।
‎
‎যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী?
‎
‎যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। ইরাকে হুথিদের উপস্থিতি ও তাদের সম্ভাব্য কার্যক্রম নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগও সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা নীতির অংশ।
‎
‎আল আরাবিয়া ইংলিশের বরাতে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, হুথিদের কার্যালয়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকি সরকারের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত যেকোনো তৎপরতা প্রতিরোধের আহ্বানও জানানো হয়েছে।
‎
‎তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি এবং ইরাকি সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত—দুটি বিষয় আলাদা। ইরাকের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যালয় বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে এমন দাবি করা উচিত হবে না।
‎
‎আঞ্চলিক সংঘাতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
‎
‎ইরাকে হুথিদের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম-সংক্রান্ত কার্যক্রম সীমিত করা হলে দেশটির ভেতরে তাদের প্রকাশ্য তৎপরতা কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে ইরাকের সঙ্গে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতাও আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
‎
‎তবে শুধু কার্যালয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করলেই ইয়েমেনের সংঘাত বা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শেষ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সংঘাতের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক।
‎
‎এ পরিস্থিতিতে ইরাকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, একদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে নিজের ভূখণ্ডকে আঞ্চলিক সংঘাতের মঞ্চ হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখা।
‎
‎সামনে কী হতে পারে?
‎
‎ইরাকি সরকার হুথিদের কার্যক্রমে আর কী ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করবে, কিংবা তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত নেবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
‎
‎সব মিলিয়ে, ইরাকে হুথিদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ইরাকের আঞ্চলিক সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনের পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
‎
‎তথ্যসূত্র: আল আরাবিয়া ইংলিশ, দ্য নিউ আরব এবং আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত প্রতিবেদন।