সৌদি আরবের পাশে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে শুরু হওয়া সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের সামরিক সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতকে কেন্দ্র করে। সৌদি আরবের আকাশসীমা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বেসামরিক জনগণকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে ব্রিটিশ টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়। তবে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানগুলোকে আপাতত প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠানো হচ্ছে; হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালানো তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য নয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধেই সম্পর্কের ভিত্তি
সৌদি আরবের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক বর্তমান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠারও আগের। ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার পার্সি কক্স এবং আরব উপদ্বীপের তৎকালীন শাসক আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের মধ্যে দারিন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ স্বার্থের সঙ্গে ইবনে সৌদের অবস্থান যুক্ত হয়। বিনিময়ে ব্রিটেন তাঁকে অর্থ ও অস্ত্রসহায়তা দেয়।
১৯২৭ সালে জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও সুসংহত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৩২ সালে ইবনে সৌদের নেতৃত্বে সৌদি আরবের আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে কূটনীতি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বিস্তৃত হয়।
ষাটের দশকে যুদ্ধবিমান কেনার সূচনা
সৌদি আরবের সঙ্গে ব্রিটেনের আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কেনাবেচার সম্পর্ক বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয় ১৯৬০-এর দশকে। ১৯৬৬ সালে সৌদি আরব ব্রিটিশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৪০টি লাইটনিং যুদ্ধবিমান এবং ২৫টি প্রশিক্ষণ বিমান কেনার চুক্তি করে। ওই সময় ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ঘিরে সৌদি আরব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ছিল।
ইয়েমেনের সংঘাত তখনও সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৬২ সালে ইয়েমেনে রাজতন্ত্রবিরোধী অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সৌদি আরব রাজতন্ত্রী বাহিনীকে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে মিসর প্রজাতন্ত্রী সরকারকে সহায়তা করে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্ব পায়।
আল-ইয়ামামা চুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র সহযোগিতা
১৯৮০-এর দশকে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের সামরিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৮৫ সালে দুই দেশের মধ্যে আল-ইয়ামামা নামে পরিচিত বড় ধরনের অস্ত্র ও বিমানসংক্রান্ত চুক্তি হয়। এর আওতায় টর্নেডো যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমানও দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে সৌদি আরব ব্রিটেনের কাছ থেকে ৭২টি টাইফুন যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে চুক্তি করে। এসব চুক্তি শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সামরিক যোগাযোগও দুই দেশের সম্পর্ককে গভীর করেছে।
হুথি সংঘাত কেন আবার ব্রিটিশ সহায়তার কেন্দ্রবিন্দু?
ইয়েমেনে হুথি আন্দোলনের উত্থান এবং ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর দেশটির সংঘাত আরও জটিল হয়ে ওঠে। সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন দেয়। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হুথিদের হামলা এবং ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে রিয়াদ ব্রিটিশ সামরিক সহায়তা চেয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা দিতে টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য এ৪০০এম সামরিক পরিবহন বিমান এবং সৌদি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। আকাশে যুদ্ধবিমানের কার্যক্রমে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তাও অব্যাহত রাখা হবে।
ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান কি হুথিদের ওপর হামলা চালাবে?
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, সৌদি আরবে মোতায়েন করা টাইফুন যুদ্ধবিমান প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালন করবে। এগুলো সৌদি শহর, বেসামরিক জনগণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষায় সহায়তা করবে। ঘোষিত পরিকল্পনায় এসব বিমান দিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালানোর কথা বলা হয়নি।
তবে যুক্তরাজ্যের সামরিক ভূমিকা একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযানে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। ফলে বর্তমান প্রতিরক্ষামূলক মোতায়েন এবং আগের আক্রমণাত্মক অভিযানের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট
সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সচল রাখাও যুক্তরাজ্যের অন্যতম উদ্বেগ। এ অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট, চিকিৎসাসেবার ঘাটতি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব দেশটির মানবিক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ব্রিটিশ সরকারও স্বীকার করেছে, সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেবল সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়; রাজনৈতিক সমঝোতা ও জাতিসংঘের নেতৃত্বে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
শতবর্ষী সম্পর্কের নতুন পরীক্ষা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার চুক্তি থেকে আধুনিক যুদ্ধবিমান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও আকাশ প্রতিরক্ষা—সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক এক শতাব্দীরও বেশি সময়ে বহু ধাপ পেরিয়েছে। হুথি সংঘাতের মধ্যে ব্রিটিশ টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন সেই সম্পর্কের সাম্প্রতিকতম অধ্যায়।
তবে এই সামরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে হামলা প্রতিরোধের সক্ষমতা, সংঘাতের বিস্তার এবং কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর। সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা এবং স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রকাশিত তথ্য।








