বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ১৮৮.৮ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশের ঋণ ও আর্থিক দায় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দেশের মোট দায় ২০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৫তম ঋণগ্রস্ত দেশ—এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে একটি টেলিভিশন গ্রাফিকে। তবে ২০৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাব এবং ঋণগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের ৪৫তম অবস্থানের বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সূত্র পাওয়া যায়নি। ফলে এসব দাবিকে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট হিসাবের উৎস ও পদ্ধতি যাচাই করা জরুরি।
সরকারি ঋণের পরিমাণ কত?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ঋণ পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশের মোট সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই সময়ে এই ঋণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪১ শতাংশের সমান ছিল।
আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের অনুপাত ছিল জিডিপির প্রায় ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত বেড়েছে।
এই ঋণের একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের শেষে মোট সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের প্রায় ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল অভ্যন্তরীণ ঋণ। বাকি অংশের মধ্যে ছিল বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য অন্তর্ভুক্ত দায়।
বৈদেশিক ঋণের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ৯৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ১৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ সরকারি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে বৈদেশিক ঋণের হিসাব এবং মোট সরকারি ঋণের হিসাব এক নয়। কারণ সরকারি ঋণের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
২০৫ বিলিয়ন ডলারের দাবি কতটা সঠিক?
ছবিতে বাংলাদেশের মোট দায় ২০৫ বিলিয়ন ডলার বলা হলেও এই অঙ্কটি কোন ধরনের দায়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। এটি কি শুধু সরকারি ঋণ, নাকি সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণসহ অন্যান্য আর্থিক দায়ের সম্মিলিত হিসাব—সেটি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে, বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৫তম ঋণগ্রস্ত দেশ—এই অবস্থান নির্ধারণের জন্য কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ডেটাবেজ ব্যবহার করা হয়েছে, কোন বছরের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং ঋণের কোন সংজ্ঞা অনুসরণ করা হয়েছে, তা জানা জরুরি।
কারণ কোনো দেশের মোট সরকারি ঋণ, মোট বৈদেশিক ঋণ এবং জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাতের ভিত্তিতে তৈরি তালিকায় অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট উৎস ছাড়া বাংলাদেশের ৪৫তম অবস্থানের দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না।
ঋণের চাপ অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে?
দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ঋণ নিয়ে থাকে। ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসল ও সুদ পরিশোধের দায়ও বাড়তে পারে। সরকারি রাজস্বের উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হলে উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য বিদেশি মুদ্রার প্রয়োজন হয়। এ কারণে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ঋণের সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা এবং ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোও দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে শুধু ঋণের মোট অঙ্ক দেখে কোনো দেশকে ঋণসংকটে রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ঋণের তুলনায় দেশের অর্থনীতির আকার, সরকারের রাজস্ব আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হয়।
ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে কী বলছে তথ্য?
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশের সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ছিল ১৮৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, একই সময়ে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
এই দুটি পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কারণ ঋণের সংজ্ঞা ও হিসাবের আওতা এক নয়। তাই ছবিতে উল্লেখ করা ২০৫ বিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি যাচাই করতে হলে এর মূল প্রতিবেদন এবং ব্যবহৃত হিসাবের পদ্ধতি জানা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ বাজেট ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে দেশের মোট দায় ২০৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বে ৪৫তম ঋণগ্রস্ত দেশ হওয়ার দাবির নির্ভরযোগ্য উৎস নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই দুটি তথ্যকে যাচাইকৃত পরিসংখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।




