
দীর্ঘ চার দশকের অপেক্ষার অবসান। আবারও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক মঞ্চের নেতৃত্বে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে আগামী এক বছরের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে এসেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বেই শুরু হয় ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম।
সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে অধিবেশনে নিজের কর্মপরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান। বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তিনি গুরুত্ব দেবেন বলে জানিয়েছেন।
এর আগে গত ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে পরাজিত করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন ড. খলিলুর রহমান। নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী ৯৯টি দেশের সমর্থন পান। এই বিজয়কে বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা এতে অংশ নেবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পেশাদার কূটনীতিক। ১৯৯১ সালে জেনেভায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন—আঙ্কটাডের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘে তার পেশাগত সম্পৃক্ততা শুরু হয়। এরপর নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ পদে প্রায় ২৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক নীতি ও গবেষণামূলক বিভিন্ন প্রকাশনাতেও তার অবদান রয়েছে। দীর্ঘদিনের জাতিসংঘ অভিজ্ঞতা এবার সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনে তাকে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নেয় ২০২০ সালে। এরপর চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ড. খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। প্রার্থিতা ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সমর্থন আদায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে ঢাকা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। প্রায় ৪০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে এসেছে।
বিশ্ব যখন যুদ্ধ, সংঘাত, জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মানবিক সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, ঠিক এমন সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়; বরং বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়ানো এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে দেশের ভূমিকা আরও জোরালো করার একটি বড় সুযোগ।