
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কয়েক সেকেন্ডেই তৈরি হচ্ছে ছবি, লেখা, ভিডিও ও নানা ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট। কিন্তু এই দ্রুতগতির প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে এমন এক পরিবেশগত খরচ, যা ব্যবহারকারীর চোখে সাধারণত দেখা যায় না—পানি।
এআই সরাসরি মানুষের মতো পানি পান করে না। তবে এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল কম্পিউটিং শক্তি। এই শক্তি সরবরাহকারী ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার উচ্চক্ষমতার সার্ভার ও গ্রাফিক্স প্রসেসর কাজ করার সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে।
সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে অনেক ডেটা সেন্টারে পানি-নির্ভর কুলিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং চিপ তৈরির সঙ্গেও পরোক্ষভাবে পানির ব্যবহার জড়িত।
এ কারণেই এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষকদের মধ্যে পানির ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডেটা সেন্টারের পানির ব্যবহার একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।
সার্ভারের দক্ষতা, বিদ্যুতের উৎস, কুলিং প্রযুক্তি, আবহাওয়া ও ডেটা সেন্টারের অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে পানির ব্যবহার কয়েক হাজার গুণ পর্যন্ত ভিন্ন হতে পারে।
তাহলে একটি ছবি তৈরিতে কত পানি লাগে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, এআই দিয়ে একটি ছবি তৈরি করতেই বিপুল পরিমাণ পানি খরচ হয়। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়।
একটি বহুল উদ্ধৃত গবেষণায় GPT-3-এর ক্ষেত্রে অনুমান করা হয়েছিল, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রায় ১০ থেকে ৫০টি মাঝারি দৈর্ঘ্যের উত্তর তৈরি করতে মোটামুটি ৫০০ মিলিলিটার পানির সমপরিমাণ পানি ব্যবহার হতে পারে। তবে এটি সরাসরি মাপা কোনো নির্দিষ্ট ‘প্রতি প্রশ্নে পানির হিসাব’ নয়; এটি নির্দিষ্ট মডেল, সময়, স্থান ও অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে করা একটি মডেলভিত্তিক হিসাব।
আর ছবি তৈরির ক্ষেত্রে হিসাব আরও জটিল। কারণ একটি এআই-জেনারেটেড ছবি তৈরি করতে সাধারণ টেক্সট উত্তরের তুলনায় অনেক বেশি কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হতে পারে।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, একটি ছবি তৈরির শক্তি ব্যবহার টেক্সট প্রম্পটের তুলনায় কয়েক দশক গুণ বেশি হতে পারে। তবে সেই শক্তিকে সরাসরি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিতে রূপান্তর করা যায় না, কারণ ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থা ও বিদ্যুতের উৎস অনুযায়ী ফলাফল বদলে যায়।
আসল উদ্বেগ কোথায়?
সমস্যাটি শুধু একটি ছবি বা একটি প্রশ্নে নয়; বড় প্রশ্ন হলো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এআই ব্যবহার করলে মোট পরিবেশগত চাপ কতটা বাড়বে।
২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী এআই অবকাঠামোর পানির পদচিহ্ন ২০২৭ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৪.২ থেকে ৬.৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গবেষণাটি একই সঙ্গে বলছে, এআই ডেটা সেন্টারের উল্লেখযোগ্য অংশ এমন অঞ্চলেও গড়ে উঠছে, যেখানে পানির ওপর আগে থেকেই চাপ রয়েছে।
আরেকটি ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে, ২০২৫ সালে এআই ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানির পদচিহ্ন কয়েকশ বিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। তবে গবেষকরাও সতর্ক করেছেন—কোম্পানিগুলো এআই ও অন্যান্য ডেটা সেন্টার ব্যবহারের তথ্য আলাদাভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রকাশ না করায় সঠিক হিসাব করা কঠিন।
প্রযুক্তির অগ্রগতি, নাকি নতুন পরিবেশগত চাপ?
এআই মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর অবকাঠামোগত খরচও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
পানির ব্যবহার কমাতে এয়ার কুলিং, উন্নত তরল কুলিং, কম পানি-নির্ভর ডেটা সেন্টার এবং পানির পুনর্ব্যবহারের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, ডেটা সেন্টার কোথায় স্থাপন করা হবে এবং কোন ধরনের কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে—এ সিদ্ধান্তগুলো এআইয়ের পানির পদচিহ্ন উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতা। কোন এআই মডেল চালাতে কত বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার হচ্ছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ করা হয় না। ফলে ব্যবহারকারীরা এআইয়ের পরিবেশগত খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান না। গবেষকেরা তাই ডেটা সেন্টার পর্যায়ে পানি ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ এবং পরিবেশগত প্রভাব পরিমাপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এআই হয়তো ভবিষ্যতের প্রযুক্তি। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে টেকসই করতে হলে শুধু এআইকে আরও শক্তিশালী করাই নয়—তার পেছনে ব্যবহৃত পানি, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক সম্পদের হিসাবও রাখতে হবে।