
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকির কাছে ইরান নতি স্বীকার করবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত কূটনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের জনগণ কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না। তবে শক্তি প্রয়োগের ভাষা বাদ দিয়ে সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানে তেহরান প্রস্তুত।
পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি ধাপ। তবে আলোচনায় এখনো কোনো বড় ধরনের সমঝোতা হয়েছে বলে প্রকাশ্যে জানায়নি কোনো পক্ষ।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, হুমকি ও চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসানো যাবে না।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান আলোচনায় প্রস্তুত, তবে সেই আলোচনায় শক্তি প্রয়োগের ভাষা গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ তেহরান কূটনৈতিক সমাধানের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছে না, কিন্তু কোনো ধরনের চাপ বা আত্মসমর্পণের শর্ত মেনে আলোচনায় যেতে চায় না।
এদিকে মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলার পাশাপাশি চুক্তি না হলে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন। এর পরদিনই পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের মঞ্চে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের সময় জাতিসংঘের অধিবেশন কক্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বেরিয়ে যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মতপার্থক্য এখনো যে গভীর, তা স্পষ্ট হয়েছে।
তবে এর মধ্যেও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনা প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনও কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না।
এর আগে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান প্রস্তুত। ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের প্রস্তাব পৌঁছানো হয়েছে বলেও জানানো হয়।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দুই দেশ নিজেদের অবস্থান থেকে কতটা সরে এসে সমঝোতার পথে এগোতে পারে। ইরান বলছে, তারা চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির জন্য চাপ অব্যাহত রাখার অবস্থানে রয়েছে।
এর মধ্যেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ শুরু হওয়াকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার দরজা খোলা থাকলেও দুই দেশের মধ্যে মূল মতপার্থক্য এখনো অনেক। তাই সামনের দিনগুলোতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকে কি না এবং কোনো পক্ষ সমঝোতার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেয় কি না, সেটিই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘে ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নয়, আবার কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ করছে না। ফলে চলমান সংঘাতের মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের একটি পথ এখনো খোলা রয়েছে।