
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের দিনের বক্তব্যের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, শক্তি প্রয়োগের ভাষা ছাড়া সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার পথ ইরানের জন্য খোলা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এবং তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ভাষণ দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান।
জাতিসংঘের মঞ্চে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ট্রাম্পের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে ইরানকে বর্ণনা করার বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়ে দাবি করেন, ইরানের জনগণই সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান তার অবস্থান থেকে সরে যাবে না এবং দেশের বিরুদ্ধে সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
‘শক্তির ভাষা নয়, কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান’
তবে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কূটনীতির ওপর তার জোর দেওয়া। কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপের পথ খোলা রাখার বার্তা দেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশটি সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে সেই আলোচনা হতে হবে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকির ভাষা ছাড়া।
তিনি বলেন, ইরান বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে চায় দুর্বলতার কারণে নয়, বরং নিজেদের সক্ষমতা ও অবস্থানের প্রতি আস্থা থেকেই।
পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যকে এমন এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং ভবিষ্যৎ সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাব
পেজেশকিয়ানের ভাষণের এক দিন আগে জাতিসংঘের একই মঞ্চে বক্তব্য দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে ট্রাম্প ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরেন এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরদিনই জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও চাপের সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ইরানের প্রতিরোধ আরও বাড়াবে।
পেজেশকিয়ান একই সঙ্গে ইরানকে যুদ্ধের সূচনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
নিহতদের ছবি দেখিয়ে বক্তব্য
ভাষণের সময় পেজেশকিয়ান ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ছবি প্রদর্শন করেন। পাশাপাশি ইরানে নিহত শিশুদের ছবিও তিনি জাতিসংঘের অধিবেশন কক্ষে তুলে ধরেন।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে বলেন, এসব হামলায় ইরানের বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলার ঘটনাও পেজেশকিয়ান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় বহু শিশু ও শিক্ষক নিহত হন। হামলার দায় ও ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ইরানের অবস্থান
জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের অধিকার রয়েছে এবং দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচি পরিচালনা করছে না।
ইরানের এই অবস্থান দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
পেজেশকিয়ান ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার বজায় রাখার পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অবস্থানও তুলে ধরেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও সতর্কবার্তা
ভাষণে হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই জলপথকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে একদিকে অন্যরা সুবিধা নেবে, অথচ ইরানকে ওই জলপথ থেকে বঞ্চিত করা হবে—এমন পরিস্থিতি ইরান মেনে নেবে না।
তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ ও জলপথকে ঘিরে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের হল ত্যাগ
পেজেশকিয়ান ভাষণ শুরু করার পর জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলও তার বক্তব্য বর্জন করে।
এ ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধের প্রতিফলন হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের খবরও রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের কথা ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও তিনি আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে কোনো আলোচনায় শক্তি প্রয়োগের হুমকি বা চাপ গ্রহণ করবে না তেহরান।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর আগে ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ফলে প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বিরোধ থাকলেও কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
যুদ্ধের মধ্যেই জাতিসংঘে মুখোমুখি অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পেজেশকিয়ানের এবারের জাতিসংঘ ভাষণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একদিকে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের তীব্র সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে একই সঙ্গে ছিল কঠোর রাজনৈতিক বার্তা এবং আলোচনার সম্ভাবনা ধরে রাখার কূটনৈতিক অবস্থান।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের কোনো পথ খুঁজে পায় কি না। প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে থাকলেও পর্দার আড়ালে যোগাযোগ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।