
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তবে আমন্ত্রণ পেলেও সম্মেলনে পুতিন সশরীরে অংশ নেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মস্কোর প্রতি ওয়াশিংটনের এই আমন্ত্রণের কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পার্শ্ববর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পুতিনকে জি-২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
রুবিওর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্মেলনটি পুতিনের জন্য শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নয়, বিশ্বের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ ও আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রুশ প্রেসিডেন্ট আমন্ত্রণটি গ্রহণ করবেন।
১৪–১৫ ডিসেম্বর মায়ামিতে জি-২০ সম্মেলন
২০২৬ সালের জি-২০ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামিতে ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনের ভেন্যু হিসেবে ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরাল মায়ামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
জি-২০ বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফোরাম। অর্থনীতি, বাণিজ্য, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে সদস্য দেশগুলোর নেতারা এখানে আলোচনা করে থাকেন। রাশিয়া জি-২০-এর সদস্য দেশ হিসেবে এখনো এই ফোরামের অংশ।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের জি-২০ সম্মেলনে ব্যক্তিগত উপস্থিতি দেখা যায়নি। পুতিন সর্বশেষ ২০১৯ সালে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি ভার্চুয়ালি একটি জি-২০ সম্মেলনে যুক্ত হয়েছিলেন।
আমন্ত্রণের বিষয়টি কীভাবে সামনে এলো
পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিলেই মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে রাশিয়াকে ২০২৬ সালের জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। সে সময় আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাঠানো হয়নি বলে জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেপ্টেম্বরে মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেন যে পুতিনকে নেতাদের সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এর ফলে সেপ্টেম্বরের ঘোষণাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুতিনের আমন্ত্রণের প্রথম প্রকাশ্য নিশ্চিতকরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণের বিষয়টি রাশিয়ার কাছেও পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।
রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সকে দেওয়া বক্তব্যে পেসকভ জানান, মস্কো আমন্ত্রণের বিষয়টি শুনেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, রাশিয়া বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এবং পরবর্তী বিস্তারিত বিষয় কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ, রাশিয়া আমন্ত্রণ পেয়েছে—এটি নিশ্চিত হলেও পুতিন মায়ামিতে যাবেন, এমন কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা এখনো আসেনি।
পুতিন-ট্রাম্প বৈঠকের সম্ভাবনা
পুতিন সম্মেলনে অংশ নিলে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সরাসরি বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মার্কো রুবিওও আমন্ত্রণের প্রসঙ্গে শুধু ট্রাম্পের সঙ্গে নয়, অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে পুতিনের আলোচনার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে এখন পর্যন্ত পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে মায়ামিতে কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক চূড়ান্ত হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ অন্য কোনো নেতার সঙ্গে পুতিনের নির্দিষ্ট বৈঠকও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
তাই সম্মেলনকে সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হলেও, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট বৈঠক বা আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
পুতিনকে জি-২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ থাকলেও যুদ্ধের অবসান নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে মায়ামির জি-২০ সম্মেলনে পুতিনের সম্ভাব্য উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সম্মেলনে তিনি অংশ নেবেন কি না এবং অংশ নিলে কী ধরনের বৈঠক বা আলোচনা হবে—তা নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
২০১৯ সালের পর প্রথম সরাসরি জি-২০ উপস্থিতি হতে পারে
পুতিন যদি আমন্ত্রণ গ্রহণ করে মায়ামিতে সশরীরে উপস্থিত হন, তাহলে ২০১৯ সালের পর এটি হবে তার প্রথম সরাসরি জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ।
এর আগে ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনে পুতিন সরাসরি উপস্থিত না থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়েছিলেন। ফলে মায়ামিতে তার সম্ভাব্য উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বিশেষভাবে নজর কাড়তে পারে।
তবে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুতিনের উপস্থিতি এখনো নিশ্চিত নয়। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বিষয়টি পর্যালোচনা করে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, আল জাজিরা, রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি ও ক্রেমলিনের বক্তব্য।