জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ সফরসঙ্গীরা। পথে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতির পর ফ্লাইটটি নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
নিউইয়র্ক সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটি জেএফকে বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁকে ম্যানহাটনের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলে নেওয়া হয়। সফরকালে এই হোটেলেই তাঁর অবস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর থেকেই জাতিসংঘ অধিবেশনকে ঘিরে ব্যস্ত কর্মসূচি শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী কার্যক্রমে যোগ দেন তিনি।
সফরের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী। ইতোমধ্যে হাইতির প্রধানমন্ত্রী, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বরও প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি।
এদিন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন তিনি।
তবে ২৩ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট।
বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি সাইড ইভেন্টে অংশ নিয়ে মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে এই আয়োজনকে দেখা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাতিসংঘ সফরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর স্বার্থ, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এরপর আসছে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ২৪ সেপ্টেম্বর।
ওই দিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ। প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, তিনি বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
এর পাশাপাশি যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত ঝুঁকি মোকাবিলায় আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। একই দিনে বাংলাদেশ আয়োজিত মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক একটি সাইড ইভেন্টেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবেও নিউইয়র্ক সফরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ, শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন। প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক শান্তি, উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন তারেক রহমান।
বর্তমান কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
অগ্রগামী বাংলাদেশ কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত