সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাত ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে এগিয়ে না আসায় এবার চীনের সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। আর রিয়াদের সেই আহ্বানের পর হুথিদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছে বেইজিং।
১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তিন ইরানি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, গত সপ্তাহে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূল এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পর সৌদি আরব চীনের কাছে সহায়তা চায়।
হুথিদের এই অগ্রযাত্রা সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ হওয়ায় সেখানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন প্রকাশ্যে এখন পর্যন্ত সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে সৌদি আরবের অনুরোধের পর তেহরানের কাছে চীনের ব্যক্তিগত বার্তা ছিল আরও নির্দিষ্ট। বেইজিং ইরানকে হুথিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চীনের এই উদ্যোগের পেছনে দেশটির নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও রয়েছে। কারণ চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর দেশটির অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ইরানের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে—তেহরানের অবস্থান হলো, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন। একই সঙ্গে চীনের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর কোনো অর্থনৈতিক চাপ বা হুমকি দেওয়ার কথা সূত্রগুলো জানায়নি।
এদিকে ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সৌদি আরবের জন্য নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রয়টার্সের আলাদা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি লোহিত সাগরের উপকূল এবং বাব আল-মান্দাবের কৌশলগত এলাকাকে নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এতে সৌদি তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং চীনের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে চীনের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রা থামাতে বা সৌদি-হুথি সংঘাত কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে চলমান সংঘাত এখন শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ইরান, চীন এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ও। ফলে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথের দিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
সূত্র: রয়টার্স।
অগ্রগামী বাংলাদেশ কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত